সোনার আলোয় আলকিত বাংলাদেশ

সোনার হরিণ ধরা দিল অবশেষে। আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশ একটা সোনা জিতুক, এই স্বপ্ন তো আমাদের বহুদিনের। ১৪টা বছর ধরে বাংলাদেশ অংশ নিচ্ছে আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে।দেখা গেল, দেশে বিজ্ঞানশিক্ষায় উৎসাহের অভাব। সবাই হঠাৎ করে বাণিজ্য পড়তে চাইতে লাগল। বিজ্ঞানে ছেলেমেয়েদের আগ্রহী করে তুলতে হবে। গণিত হলো সব বিজ্ঞানের মূল।

গণিতের জন্য পাতা চাই। গণিত নিয়ে উৎসব চাই। শুরু হলো জাতীয়ভিত্তিক গণিত উৎসব। সারা দেশে আঞ্চলিক আয়োজনে ছুটে যেতে লাগলেন দেশের সেরা গণিতের অধ্যাপকেরা। স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের ডেকে বললেন-গণিত শেখো, স্বপ্ন দেখো। ২০১০ সালের মধ্যে আমরা আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে মেডেল চাই। ২০১৭ সালের মধ্যে সোনা চাই। ব্রোঞ্জ এল এক বছর আগে, ২০০৯ সালে। আর ২০১৮ সালে, টার্গেটের একটা বছর পরে এল সোনা।


রোমানিয়া থেকে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের সাধারণ সম্পাদক মুনির হাসান জানাচ্ছেন, এবার রোমানিয়ার ক্লুজ-নাপোকা শহরে অনুষ্ঠিত ৫৯ তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে ৪২-এর মধ্যে ৩২ নম্বর পেয়ে দেশের জন্য প্রথম সোনার পদকটি জিতে নিয়েছে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট ইংলিশ স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থী আহমেদ জাওয়াদ চৌধুরী। দলের তিনজন সদস্য তাহনিক নূর সামিন (২৩), জয়দীপ সাহা (১৯) ও তামজিদ মুর্শেদ রুবাব (১৮) পেয়েছে ব্রোঞ্জ পদক। অপর দুজন সদস্য রাহুল সাহা ও সৌমিত্র দাস সম্মানজনক স্বীকৃতি অর্জন করেছে।


ওদের প্রশিক্ষক মাহবুব মজুমদারও ফেসবুকে আমাদের জানাচ্ছেন এই সুসংবাদ। বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সভাপতি জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যার নিশ্চয়ই মহা খুশি।

স্বপ্নের কথা বলছিলাম। গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির আরও স্বপ্ন আছে। তারা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেখতে চায় বাংলাদেশির হাতে। আমরা জানি, এই স্বপ্নও খুব শিগগির বাস্তবায়িত হতে পারে। বাংলাদেশি বিজ্ঞানীরা নানা দেশে খুবই ভালো কাজ করছেন।

আমিও গণিতের উৎসবে ঢাকা আর ঢাকার বাইরে গেছি অনেকবার। উফ্। কী যে এক প্রেরণাদায়ী অভিজ্ঞতা হয়। হাজার হাজার ছেলেমেয়ে জড়ো হয়, তারা ব্যান্ডের গান শুনতে আসেনি, ফুটবল দেখতে আসেনি, এসেছে গণিত চর্চা করতে। আর কী প্রাণবন্ত সব প্রশ্ন তারা করে। আর আমাদের শিক্ষকেরা, প্রবীণ সব শিক্ষক, ভাঙাচোরা মাইক্রোবাসে চড়ে ঘুরে বেড়ান চট্টগ্রাম থেকে খুলনা, সিলেট থেকে দিনাজপুর। একবার-দুবার সড়ক দুর্ঘটনার শিকারও হয়েছেন তাঁরা। ভাবা যায়, ড. আতাউল করিমের মতো বড় বিজ্ঞানী, আবেদ চৌধুরীর মতো জিনবিজ্ঞানী মাইক্রোবাসে চড়ে যাচ্ছেন কুমিল্লায় কিংবা ময়মনসিংহে, গণিত অলিম্পিয়াডের উৎসবে অংশ নিতে।

আর বিদেশে কী যে সুনাম এই গণিত অলিম্পিয়াডের। আমাদের ছেলেমেয়েরা সারা পৃথিবীর বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে সরাসরি ভর্তি হতে পারছে শুধু গণিত অলিম্পিয়াডে ভালো করছে বলে। হার্ভার্ড, এমআইটি, ক্যালটেক, প্রিন্সটনের দ্বার তাদের জন্য খুলে যাচ্ছে।

আমরা গত বছর ভারতকে হারিয়েছিলাম। বাংলাদেশ হয়েছিল ২৬ তম, ভারত হয়েছিল ৫২। এবার ওরা হয়েছে ২৮, আমরা ৪১, কিন্তু এবার ওরা সোনা পায়নি, বাংলাদেশ সোনা পেয়েছে। বিশাল ভারতকে গণিতের প্রতিযোগিতায় পেছনে ফেলা যা-তা কথা নয়।

গণিত অলিম্পিয়াড এবং উৎসবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে অভিনন্দন। প্রথম আলো একটা পত্রিকা। ডাচ্বাংলা একটা ব্যাংক। তারা মিলে কী সুন্দর একটা আয়োজন বছরের পর বছর করে যাচ্ছে। শুধু তো গণিত উৎসব নয়, আয়োজন করে নিবিড় কর্মশালা। সেখান থেকেই বাছাই করে প্রশিক্ষিত কিশোর তরুণেরা যায় আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে।

এই আয়োজনে সাহায্য করেন প্রথম আলো বন্ধুসভার কর্মীরা। আর আছে মুভার্স, ম্যাথ অলিম্পিয়াড ভলান্টিয়ার্স।

চারদিকে নানা দুঃসংবাদ। তারুণ্যের মন বুঝছেন না প্রবীণেরা। তরুণেরাও বড় বেশি ক্যারিয়ার ক্যারিয়ার করছেন। এর মধ্যে এমন একটা সুসংবাদ আমাদের কিছুটা আশান্বিত করে তুলবে বৈকি। আমাদের জনপ্রিয় গান আছে, এ কী সোনার আলোয় জীবন ভরিয়ে দিলে, ও গো বন্ধু পাশে থেকো।

আসুন, পাশে থাকি, তারুণ্যের, মেধার, বিজ্ঞানের, গণিতের, শুভ প্রয়াসের, শুভবাদের।

সবাইকে আবারও অভিনন্দন।
Share on Google Plus

About Md. Mokhlasur Rahman

0 comments:

Post a Comment